
মহিউদ্দিন রানা, নিজস্ব প্রতিবেদক (ময়মনসিংহ):
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে একটি হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে থানায় ধরে এনে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। একপর্যায়ে ৬০ হাজার টাকা দিলে মুক্তি
মিলে চারজনের। এমন অভিযোগ উঠেছে ঈশ্বরগঞ্জ থানা পুলিশের বিরুদ্ধে। এদিকে হত্যা মামলার প্রকৃত আসামিরা অধরা থাকলে স্থানীয়দের ক্ষোভের মাধ্যমে থানায় ৪ জনকে ধরে এনে মারধরের পর টাকায় মুক্তি মেলার বিষয়টি সামনে আসে।
জানা যায়, গত বছরের ১ অক্টোবর ভোর রাতে জাটিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে কর্মরত নৈশ প্রহরী আরমানকে হত্যা করা হয়। নিহত মো. আরমান স্থানীয় বাসিন্দা মো. লোকমান হেকিমের ছেলে। ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর সে জাটিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী হিসাবে যোগদান করে কর্মরত অবস্থায় নিহত হন। আরমান হত্যার বিষয়টি নিয়ে ঘটনার দিন রাতেই মা শামছুন নাহার ওরফে ঝরনা বাদি হয়ে ৬ জনকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই দিনেই আরমান হত্যার প্রধান আসামী ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার মাসুদ রানা আটক করে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়। মামলার আর কোনো আসামীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
এদিকে আরমান হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামীরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় গত এক সপ্তাহ ধরে এলাকাবাসী ও জাটিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ কর্মসূচি করছে। এতে সমানে এসেছে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে চারজনকে থানায় নিয়ে মারধার ও পুলিশের টাকা আদায়ের ঘটনা। মামলাটির সুষ্ঠু তদন্তের জন্য গত ৪ মার্চ স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে এলাকাবাসী একটি লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগটি তদন্তের জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার এরশাদুল আহমেদ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আরমান হত্যায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি থানার ওসি ওবায়দুর রহমানের নির্দেশনায় এসআই নজরুল ইসলাম এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরিফ বিল্লাহ (৪৬), রিফাতুল ইসলাম (২৩), বাবুল মিয়া (২১) ও রোমান মিয়া (২০) নামের চারজনকে থানায় নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এক পর্যায়ে আটকদের পরিবারের কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। অন্যথায় আরমান হত্যা মামলায় তাদের ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। আটক তরুণ বাবুলের বাবা মোনায়েম হোসেন হত্যা মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই নজরুল ইসলামের সাথে ৬০ হাজার টাকা রফা করে পরিশোধ করেন। পরে আটক চারজনকে পরদিন রাতে মুক্তি দেওয়া হয় বলে দাবি ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের।
ভুক্তভোগী তরুণ রিফাতুল ইসলাম বলেন, রাত ১২টার দিকে আমি আমার বাড়িতে ফোনে বন্ধুর সাথে কথা বলছিলাম। হঠাৎ আট থেকে নয়জন পুলিশ আমাকে ঘিরে ধরে বলে বাজারে যেতে হবে। ওখানে ওসি স্যার দাড়িয়ে আছে তোমার সাথে কথা বলবে। বাজারে আনার পর তারা পুলিশের গাড়িতে তুলে ফেলে। থানায় নিয়ে গিয়েই আমাকে এবং আরেক রোমান মিয়াকে হাতকড়া পড়িয়ে একটি দেওয়ালের সাথে ঝুলিয়ে রাখে। ঘন্টা খানেক পর ওই অবস্থায় জিজ্ঞাসাবাদ করে। আরমানকে কারা হত্যা করেছে সেটা জানতে চায়। আরমানকে হত্যার সময় আমি বাড়িতে ছিলাম না। আমি ঢাকায় কাজ করি। একমাস পর বাড়িতে এসেছি। তবুও আমাকে আরমান হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়।
বাবুল মিয়া বলেন, আমাকেও বাড়ি থেকে ধরে নেওয়া হয়। থানায় নিয়েই আমার চোখ বেঁধে লাঠি দিয়ে মারতে শুরু করে। আরমানকে কারা মেরেছে সেটা জানতে চায়। আমি কিছুই জানিনা বললে তারা আরো বেশি মারতে থাকে। পরের দিন এসআই নজরুলের সাথে আমার বাবার কথা হয়। ওই সময় বাবার কাছে ১৫ লাখ টাকা চায়। বাবা আমার মারধর দেখে ও হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দিতে পারে এমন ভয়ে কিছু টাকা দিতে রাজি হয়। পরে চার জনে ১৫ হাজার করে মোট ৬০ হাজার টাকা দিয়ে আমাদের মুক্ত করে। মুক্তি দেওয়ার আগে সাদা কাগজে স্বাক্ষরসহ তাদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হয়নি কিংবা কোনপ্রকার নির্যাতন করা হয়নি মর্মে আমাদের কথা ভিডিও রের্কড করে রাখে।
বিষয়টি নিয়ে জাটিয়া বাজার কমিটির সভাপতি আবুল বেপারী বলেন, আরমান হত্যা মামলাটি ভিন্নখাতে নিতে এলাকার চারজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে এনেছে শুনেছি।
আরমান হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ঈশ্বরগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম জানান, জিজ্ঞাসাবাদের পর কোন প্রকার সন্দেহ না হওয়ায় চারজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল আটকদের ব্যক্তিদের নির্যাতন করা হয়নি এবং তাদের কাছ থেকে কোন টাকাও নেওয়া হয়নি।
ঈশ্বরগঞ্জ থানার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছিল।
ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। আর কোন টাকা পয়সা নেওয়া হয়নি। তাছাড়া এলাকাবাসী আমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেনি, মামলাটি যেন সুষ্ঠু তদন্ত হয় সেজন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেছে।’