ময়মনসিংহের নান্দাইলে শিক্ষক নিয়োগের ১১ বছর পার হলেও বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত দুই শিক্ষিকা। এ দিকে অনুপস্থিত থেকেও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর হচ্ছে অলৌকিকভাবে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ দুই শিক্ষিকাকে কোনদিন দেখেনি বিদ্যালয়ে।
এমন ঘটনা উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা উচ্চ বিদ্যালয়ে। দুই শিক্ষিকার মধ্যে প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী কামরুন নাহার সুধা অপরজন তার ছোট ভাই মেহেদী হাসান মানিকের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়- ২০০২ সালে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের হালিউড়া গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থাপন করেন। বিদ্যালয়টি ২০১০ সালে নিম্ন মাধ্যমিক ও ২০২২ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে এমপিভুক্ত হয়।
বিদ্যালয়ে ১৫ জন শিক্ষক কর্মচারি রয়েছে। এদের মধ্যে ৯ জন শিক্ষক, চর্তুথ শ্রেণীর ৫ জন ও তৃতীয় শ্রেণীর ১ জন কর্মচারি রয়েছে। এদিকে ২০১৫ সালে প্রধান শিক্ষকের পিতা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক বিদ্যালয়ের সভাপতি থাকাকালীন সময়ে নিজের দুই পুত্রবধূ কামরুল নাহার সুধা ও মাহমুদা আক্তারকে চাকুরিতে নিয়োগ দেন।
সম্প্রতি, মুক্তিযোদ্ধা উচ্চ বিদ্যালয় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সকাল ১১ টা ২০ মিনিটে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন। প্রধান শিক্ষকের কক্ষে চোঁখ পড়ে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার। সেখানে আওয়ামীলীগ সরকারের উন্নয়নমূলক বই ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা বই সারিবন্ধ ভাবে সাজানো রেখেছেন।
বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলার বারান্দায় ৪-৫ শিক্ষার্থী গল্পে আড্ডায় মেতে উঠেছে। কয়েকজন শিক্ষক বিভিন্ন শ্রেণী কক্ষে পাঠদান করাচ্ছেন। বিদ্যালয়ে গিয়ে অন্যান্য শিক্ষক কর্মচারি পাওয়া গেলেও কামরুন নাহার সুধা ও মাহমুদা আক্তারকে পাওয়া যায়নি। প্রধান শিক্ষকের কাছে হাজিরা দেখতে চাইলে তিনি অন্য বিষয়ে এড়িয়ে যান। তবে অন্য এক শিক্ষক দিয়ে হাজিরা আনলেও সেখানে অনুপস্থিত শিক্ষকের স্বাক্ষর ধরা পড়ে।
এদিকে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত দুই শিক্ষিকার বেতন ভাতা চালু করতে জেলা মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা কার্যালয়ের উপপরিচালক বরাবর আবেদন দিয়েছেন প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন।
অভিযোগ রয়েছে দুই শিক্ষিকার অনুপস্থিত ব্যাপারে মন্তব্য করায় বিদ্যালয়ের এ কে এম মোশাররফ হোসেন নামের এক শিক্ষককে ২০১৯ সালে বিদ্যালয় থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন।
বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে গিয়ে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের কাছে দুই শিক্ষিকার কথা জানতে চাইলে শিক্ষার্থীরা তাদের চিনেন না বলেও জানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ছাত্র জানান- দুই শিক্ষিকা প্রধান শিক্ষকের আত্নীয় থাকায় তারা বিদ্যালয়ে আসে না কোনদিন। হাজিরা খাতায় আবার দেখবেন তাদের স্বাক্ষর আছে। আমরা কিছু বললে আমাদের বিদ্যালয় থেকে বের করে দিবে।
এদিকে দুই শিক্ষিকাকে বিদ্যালয়ে গিয়ে পাওয়া যায়নি। তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্ঠা করেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
মুক্তিযোদ্ধা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, দুজন শিক্ষিকা ২০১৫ সালে নিয়োগ হয়েছে তবে তারা মাঝে মধ্যে আসে। বেতন ভাতা চালু হয়নি তো আর স্কুল থেকেও কিছু পায়না। দুজন শিক্ষিকা কারা এমন প্রশ্ন করলে একজন নিজের স্ত্রী অপরজন ছোট ভাইয়ের স্ত্রী বলে জানান তিনি।
নান্দাইল উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মফিজুল ইসলাম বলেন, আমি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেছি বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে এমন হলে বিষয়টি অপরাধ।
নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, নিয়োগ পেয়েও যদি বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে সেটি খুবই গুরুতর অপরাধ। এ বিষয়টি আমি খোঁজখবর নিয়ে দেখবো।
ময়মনসিংহ জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহছিনা খাতুন বলেন, লোকাল অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিষয়টি আমার কাছে জানা নেই, জেলা উপ-পরিচালক বিষয়টি জানেন বলে ফোন কেটে দেন।
ময়মনসিংহ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা কার্যালয়ের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহা. নাসির উদ্দীন মুঠোফোনে বলেন, এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। বেতন ভাতা চালুর জন্য আবেদন করেছিল সেটি বন্ধ রাখা হয়েছে। আমরা আগামী সপ্তাহে সরেজমিনে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিব।