বাংলাদেশের বুকজুড়ে ছড়িয়ে আছে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, জীবনযাপন, খাবার, পোশাক ও লোকঐতিহ্য। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গেলেই বদলে যায় মানুষের ভাষা, খাবার ও জীবনধারা। এর সঙ্গে রয়েছে বাঙালির চিরন্তন আতিথেয়তা। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলই যেন পর্যটনের আলাদা এক গল্প।
কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পর্যটনের সেই গল্প কতটা জায়গা পেয়েছে?
প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে পর্যটন ও আতিথেয়তা নিয়ে আলাদা করে জানার সুযোগ খুবই সীমিত। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পর্যটনকে শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। গল্প, কবিতা, গান ও লোকগাথার মধ্যেও ভ্রমণ ও পর্যটনের নানা অনুষঙ্গ উঠে আসে।
পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় কাজী নজরুল ইসলামের পংক্তি পড়েছিলাম—
“থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগৎটাকে!”
তখন হয়তো এর গভীরতা সেভাবে বোঝা হয়নি। কিন্তু বড় হয়ে মনে হয়েছে, সেই ‘জগৎ’ দেখার শুরুটা নিজের দেশকে দিয়েই হতে পারে। কারণ বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে আছে দেখার মতো অসংখ্য গল্প।
পর্যটন ও আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে বিষয়টি আরও কাছ থেকে বোঝার সুযোগ হয়েছে। তখন উপলব্ধি হয়েছে, পর্যটন মানে শুধু কোনো দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, খাবার, ঐতিহ্য, পরিবেশ ও আতিথেয়তা।
চট্টগ্রামের কালা ভুনা, পুরান ঢাকার কাচ্চি, কুমিল্লার রসমালাই, চাঁদপুরের ইলিশ, রাজশাহীর আম কিংবা কক্সবাজারের শুঁটকি—এসব শুধু খাবার নয়; প্রতিটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে নির্দিষ্ট অঞ্চল ও মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়।
ছোটবেলা থেকেই হোক পর্যটনচর্চা
প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিশুদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, ঐতিহাসিক স্থান, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও প্রকৃতি সম্পর্কে বয়সোপযোগী ধারণা দেওয়া যেতে পারে। গল্প, ছবি, মানচিত্র ও ভ্রমণকাহিনির মাধ্যমে তাদের নিজের দেশকে নতুন করে চেনানো সম্ভব।
মাধ্যমিক পর্যায়ে যুক্ত হতে পারে দায়িত্বশীল ভ্রমণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়গুলো। আর উচ্চমাধ্যমিকে পর্যটনশিল্প, আতিথেয়তা, কর্মসংস্থান ও টেকসই পর্যটন নিয়ে আরও বিস্তৃত ধারণা দেওয়া যেতে পারে।
এতে শুধু পর্যটন বিষয়ে পড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীরাই উপকৃত হবে না; বরং একটি প্রজন্ম নিজের দেশ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে আরও সচেতন হয়ে উঠবে।
নিজের দেশকে চেনার মধ্য দিয়েই শুরু
বাংলাদেশের পর্যটনের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু পাহাড়, সমুদ্র, নদী কিংবা বন নয়; এর সঙ্গে রয়েছে এ দেশের মানুষ ও তাদের জীবনযাপন।
তাই পর্যটনকে শুধু বিনোদনের বিষয় হিসেবে না দেখে শিক্ষা ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবেও ভাবা প্রয়োজন। বাংলার সাহিত্য, লোকগান, খাবার, পোশাক, উৎসব ও ঐতিহ্যকে পর্যটনচর্চার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
নিজের দেশকে জানার আগ্রহ থেকেই তৈরি হতে পারে দায়িত্বশীল পর্যটক, সচেতন নাগরিক এবং ভবিষ্যতের নতুন উদ্যোক্তা।
কাজী নজরুল ইসলামের সেই আহ্বান তাই আজও প্রাসঙ্গিক—
“থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগৎটাকে!”
আর সেই জগৎ দেখার প্রথম পাঠটি হতে পারে—নিজের দেশকে নতুন করে চেনা।